উত্তরাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি

193636bonna-kk

দেশের উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটেছে।

উজানের ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢল ও গত কয়েক দিনের অবিরাম বৃষ্টিতে নওগা, কুড়িগ্রাম ও বগুড়া জেলার কয়েকটি স্থান নতুন করে বন্যা প্লাবিত হয়েছে। এ বন্যায় আরো ৩ জনের মৃত্যু এবং ১ জনের নিখোঁজের খবর পাওয়া গেছে। এনিয়ে দেশের ২০টি জেলায় বন্যার কারণে মোট ২০ জনের প্রাণহানি ঘটে। সরকারিভাবেও প্রাণ হানির এ সংখ্যা নিশ্চিত করা হয়েছে।

এদিকে বন্যার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীর বিক্রম আজ রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলন করেছেন। এতে দুর্যোগ মোকাবেলায় সক্ষমতার পাশাপাশি বন্যা মোকাবেলায় সরকারের সার্বিক প্রস্তুতি তুলে ধরা হয়।

সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি এবং উত্তরাঞ্চলের রন্যাকবলিত জেলাগুলোসহ মোট ২০ জেলায় এ পর্যন্ত বন্যার কারণে ২০ জনের প্রাণহানির সত্যতা স্বীকার করে ত্রাণমন্ত্রী এ সংবাদ সম্মেলনে জানান দেশের ২০ টি জেলার ৩৫৬টি উপজেলায় ৯৭৩টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয় কেন্দ্রে ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৫৮৬ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছে।

বন্যার্তদের আশ্রয় ও খাদ্য প্রদান, চিকিৎসা ও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রাখতে বন্যা কবলিত ২০টি জেলায় সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করে বন্যার্ত মানুষের সেবায় নিয়োজিত থাকতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

অপরদিকে উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি এলাকা নতুন করে বন্যাপ্লাবিত হয়েছে।

ছোট যমুনা নদীর ফ্লাড ওয়ালের আউটলেট দিয়ে পানি প্রবেশের ফলে নওগাঁ শহরের কয়েকটি এলাকা আজ প্লাবিত হয়েছে। শহরের বন্যাপ্লাবিত মহল্লাগুলোর রাস্তাসহ বাড়িঘরে পানি ঢুকায় এসব এলাকার প্রায় ৪০ হাজার মানুষ জলমগ্ন হয়ে পড়েছে।

অপরদিকে ধরলা, ব্রহ্মপুত্র ও দুধকুমোর-এ তিনটি নদ-নদীর পানি অস্বাভাবিকহারে বৃদ্ধি পাওয়ায় কুড়িগ্রামের বন্যা পরিস্থিতি এখন ভয়াবহ। এ জেলার ৯টি উপজেলার ৬০টি ইউনিয়নের প্রায় ৪ লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।

সোমবার সকালে জেলার রাজার হাটের টগরাইহাট গ্রামের বড়কুলের পার এলাকায় রেল ব্রিজের গার্ডার ধসে পড়ায় (এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সময় বিকেল সাড়ে তিনটা) সারা দেশের সাথে এ জেলার রেলযোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়াও বিভিন্ন স্থানে সড়ক ভেঙে যাওয়া ও সড়কে পানি ওঠায় জেলার সাথে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বন্যার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় ৬০৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠদান কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে।

অন্যদিকে বগুড়ায় যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় এ নদীর সংযোগ নদী ‘বাঙ্গালি’র পানিও বৃদ্ধি পেয়ে বিপদ সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ‘বাঙ্গালী’ নদী সংলগ্ন এ জেলার ৩টি উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় প্রায় ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

এদিকে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র থেকে আজ সোমবার মিডিয়ায় পাঠানো বন্যা সংক্রান্ত বিশেষ বুলেটিনে বলা হয়েছে, গত কয়েক দিনে ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকায় পানি বাড়ার ফলে দেশের উত্তরাঞ্চল এবং উত্তর-পূর্বের নিমণাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি অবনতিশীল রয়েছে। পানি বড়ার এ প্রবনতা অব্যাহত থাকলে দেশের মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলেও বন্যা বিস্তৃত হতে পারে।

নওগাঁ’র মান্দা উপজেলায় আত্রাই নদীর দু’টি স্থানে মুল বাঁধ এবং ৬টি স্থানে বেড়ীবাঁধ ভেঙ্গে ৯টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে।

এছাড়াও ছোট যমুনা নদীর ফ্লাড ওয়ালের আউটলেট দিয়ে পানি প্রবেশের ফলে নওগাঁ শহরের কয়েকটি এলাকা বন্যাপ্লাবিত হয়ে পড়েছে। এসব এলাকার রাস্তা এবং বাড়িঘরে পানি ঢুকায় প্রায় ৪০ হাজার মানুষ জলমগ্ন হয়ে পড়েছেন।

মান্দা উপজেলার নির্বাহী অফিসার মোঃ নুরুজ্জামান আজ সোমবার বার্তা সংস্থা কে জানান মান্দা উপজেলায় আত্রাই নদী সংলগ্ন মূল বাঁধ ও বেড়ী বাঁধের পৃথক ৮টি স্থান ভেঙ্গে গেছে। এর মধ্যে বুড়িদহ সুজনসখি ঘাট এবং চকমারপুর নামকস্থানে মুল বাঁধ ভাঙ্গার ঘটনাও রয়েছে। অপরদিকে পার নুরুল্যাবাদ, চকরামপুর, চকবালু, কয়লাবাড়ি ও কয়াপাড়া কলেজ মোড়ে বেড়ীবাঁধ ভেঙ্গে গেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সুত্রে জানা গেছে সোমবার দুপুর ১২টায় আত্রাই নদীর পানি ধামইরহাট পয়েন্টে বিপদসীমার ১৮০ সেন্টিমিটার, আত্রাই পয়েন্টে বিপদসীমার ৫৬ সেন্টিমিটার, মান্দা পয়েন্টে বিপদসীমার ১০৬ সেন্টিমিটার ও মহাদেবপুর পয়েন্টে বিপদসীমার ১৬০ সেন্টিমিটার এবং ছোটযমুনা নদীর নওগাঁ পয়েন্টে বিপদসীমার ৪৯ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

আকস্মিক বন্যার কারণে মান্দা উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আজ জরুরি সমন্বয় সভা আহবান করা হয়। বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী মুহাঃ ইমাজুদ্দিন প্রামানিক এবং জেলা প্রশাসক ড. মোঃ আমিনুর রহমান এ সমন্বয় সভায় অংশগ্রহণ করেন।

এদিকে ছোট যমুনা নদীর ফ্লাডওয়ালের আউটলেট দিয়ে নওগাঁ শহরে পানি ঢুকায় শহরের ডিগ্রির মোড়, বিহারীকলোনী, উকিলপাড়া, জেলাপ্রশাসকের বাসভবন, পুরাতন কোর্ট এলাকা, সুপারীপট্টি, কালিতলা মহল্লা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। উকিলপাড়া সড়ক, কাচাড়ী সড়ক, কেডি’র মোড় থেকে মুক্তিরমোড় সড়ক পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

প্লাবিত এলাকা পরিদর্শন শেষে জেলা প্রশাসক ড. মোঃ আমিনুর রহমান বলেছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তালিকা তৈরীর কাজ চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদানের উদ্যোগ নেয়া হবে।

কুড়িগ্রাম ধরলা, ব্রহ্মপুত্র ও দুধকুমোর নদীর পানি অস্বাভাবিকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সোমবার সকালে ধরলা নদীর পানি বিপদসীমার ১৩২ সেন্টিমিটার এবং ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপদসীমার ৬৮ সেন্টিমিটার ও দুধকুমোর নদীর পানি বিপদ সীমার ৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

এদিকে বন্যায় এ জেলায় ৩ জনের মৃত্যু এবং ১ জনের নিখোঁজের সংবাদ পাওয়া গেছে। পানিতে ডুবে মারা গেছেন রায়গঞ্জের মনসুর (১৪) ও ফুলবানু (১৩)। মৃত আরেক জনের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে পাওযা যায়নি।

রাজারহাটের ছিনাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নুরুজাম্মান বুলু কে জানান, রোববার দিবাগত গভীর রাতে কালুয়ারচর ওয়াপদা বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় রিফাত (১০) ও লোকমানের স্ত্রী (৩২) পানির তোড়ে ভেসে গেছে। এদের মধ্যেএকজনের লাশ জেলা প্রশাসন উদ্ধার করেছে।

সদরের কাঁঠালবাড়ীর বাংটুরঘাট , রাজারহাটের কালুয়া ও ফুলবাড়ীর গোড়ক মণ্ডল এলাকায় বাঁধ ছিঁড়ে যাওয়ায় বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রুপ ধারণ করেছে। বাধের ভাঙ্গা অংশ দিয়ে পানি ঢুকে নতুন করে আরেও ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিতে ডুবে ৮৩টি কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। গত ২৪ ঘন্টায় পানির স্রোতে প্রায় শতাধিক পরিবারের বাড়িঘর ভেসে গেছে এবং ৪২ হাজার হেক্টর জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।

কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মোহাম্মদ ফেরদৌস খান জানিয়েছেন, বন্যা মোকাবেলায় সব ধরণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বন্য কবলিত উপজেলাগুলির প্রতিটি উপজেলায় ২৫০ মেট্রিক টন চাল এবং নগদ ৫ লাখ টাকা করে বরাদ্ধ দেয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের কাছে নতুন করে ২ হাজার মেট্রিক টন চাল ও নগদ ৫০ লাখ টাকা ও ৩০ হাজার শুকনো খাবার বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বগুড়া গত কয়েক দিন ধরে বৃষ্টিপাত ও উজ্জান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে যমুনা ও বাঙ্গালী নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে দ্বিতীয় দফা বন্যা হয়েছে।

যমুনার পানি আজ দুপুরে সারিয়াকান্দি পয়েন্টে বিপদ সীমার ৯৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল বলে স্থাানীয় পানি উন্নয়ন সূত্রে জানা গেছে।
বগুড়া জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আবু হেনা মো. শাহারুল ইসলাম জানিযেছেন, যমুনা নদীতে পানি বৃদ্ধির ফলে ৩ উপজেলার ১৪ টি ইউনিয়নের ১৫ হাজার পরিবার পানি বন্দী হয়ে পড়েছে। এতে সারিয়াকান্দি উপজেলার ৯ হাজার ১৩০ পরিবার, সোনাতলায় ৪ হাজার ৮৫, ধুনট ২ হাজার ২৪০ পরিবারের প্রায় ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

দ্বিতীয় দফায় বন্যায় ৫১০ হেক্টর জমির ফসল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক প্রতুল চন্দ্র সরকার।

বগুড়ার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নূরে আলম সিদ্দিকী জানান, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নগদ ১ লাখ টাকা ও ৫০ মেট্রিক টন চাল সারিয়াকান্দি বন্যা দুর্গত এলাকায় বিতরণ করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *